এইচ,এম, মোবারক
শিক্ষক ও সাংবাদিক
শুভ কথাটি অতি শুভ। অত্যান্ত আনন্দের সাথে শব্দটি আমরা উপভোগ করে থাকি।কেউবা শুভ জন্ম দিনে আবার কেউবা শুভ নববর্ষে, আবার কেউবা শুভ ম্যারেজ ডে তে, এরকম ইত্যাদি ইত্যাদিতে।আমরা যদি “শুভ হালখাতা” এই শব্দ দুটোর কথা ভাবী, তাহলে যা দেখতে পাই, প্রতি বছর আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে সারা মাস জুড়ে চলতে থাকে এই “শুভ হালখাতা”।
সেই হালখাতার যে বেহাল অবস্থা বা তার যে হালে খাল (চামড়া) খুলতে বসেছেন ব্যবসায়ীসহ খরিদ্দারগন, সেই কথা গুলো লিখতে গিয়ে কেটেছে আজকের এই ব্যস্ত সময়। হালখাতার নাম পরিবর্তন থেকে শুরু করে তার অতীত ঐতিহ্য সব কিছুই আজ সভ্যতার অতল গর্ভে হারাতে বসেছে, অর্থাৎ বিলীন হতে বসেছে।
একদিন দেখলাম, এক জনৈক ব্যবসায়ী তার শুভ হালখাতার কার্ডের শিরোনাম লিখেছেন “শুভ মহা খরিদ্দার সম্মেলন” অপর একজন লিখেছেন ”শুভ বাৎসরিক খাতা নবায়ন” এখানে প্রতীয়মান হয় যে, হালখাতার সম্মান নিয়ে নয়, নাম নিয়ে টানা হেছড়া শুরু হয়েছে। হয়তোবা তারা তাদের নাম পরিবর্তনের জন্য কোনো কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নয়, কেননা আমরা এখন মুক্ত স্বাধীন দেশের নাগরিক। অবশ্যই আমরা স্বাধীনভাবে চলব এবং স্বাধীনভাবে বলব, এটাইতো বাক স্বাধীনতা।
তাছাড়া দোকানদার – খরিদ্দারদের চাপা- চাপি ও ঠাসা- ঠাসির ভিড়ে, বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া, থুড় থুড়ে বুড়ো “শুভ হালখাতা” আজ ঝুল-কালি আর ময়লা পড়া বেড রুম থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথবা বাড়ি কর্তার মৃত্যুর পর তার বংশ রক্ষা করার জন্য হয়তোবা এদের জন্ম হতে পারে বলে আমার ধারণা। যাইহোক নাম নিয়ে আর কথা বাড়াবো না, কেননা নামেই তো বংশ পরিচয় বহন করে না, করে তার আচার আচরণ, ব্যবহার ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে। তাই এখন বলতে চাই “শুভ হালখাতার” আচার অনুষ্ঠানের কথা। সংগত কারণে একটু পিছনে ফিরে যেতে হচ্ছে।
প্রিয় পাঠক,
আমরা তখন অনেক ছোট ছিলাম।সেসময় ও হালখাতা অনুষ্ঠিত হয়েছে, আমাদের বাবা-চাচারা সহ এলাকার গন্যমান্য ব্যাক্তি বর্গ এই হালখাতায় আমন্ত্রিত হতেন।কিন্তু এতো সৌখিন কার্ডের মাধ্যমে নয়, মৌখিকভাবে। দোকানদারগণ দাওয়াত করার জন্য সকল খরিদ্দারগণের বাড়ি বাড়ি যেতেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, ঐ ব্যবসায়ীর কোন গণ্যমান্য প্রতিবেশি যদি হালখাতার দাওয়াত না পেয়ে থাকে তাহলে ঐ ব্যাক্তি নিজেকে খুব ছোট মনে করতেন। নিজেকে অপমানিত বোধ করতেন।
অনুষ্ঠান চলেছে সারাদিনব্যাপি, সেখানে ব্যবসায়ী ও খরিদ্দারের মধ্যে এক অপরুপ সোহার্দ্যপূর্ন আচার আচরণ ও সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে।সেখানে আদর আপ্যায়ণ শেষে খরিদ্দারগণকে পান বিড়ি সিগারেট দিয়ে তাদের মন তুষ্ঠ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফুলে ফুলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সাজানোর কথা নতুনভাবে আর বলার দরকার নেই।কারণ সেটা আজ অব্দি চলমান আছে। এবার যারা নিমন্ত্রণ পেয়ে হালখাতা খাওয়ার জন্য এসেছেন তারা তাদের বাঁকীর পরিমানটা জেনে নিয়ে যথারীতি তা পরিশোধ করার পর অতিরিক্ত কিছু টাকা মহাজনের হাতে ধরিয়ে দিতেও দেখা গেছে।
এভাবে উভয়ের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে দিনটা যেন হয়ে উঠতো উৎসব মুখর এক অনাবিল আনন্দের দিন।কবির ভাষায়,”নেহায়েত অসমর্থ না হলে কেই যেন বাঁকীর ঘরে নাম রাখতে চায় না”।
এর পরবর্তী পর্যায়ে যখন পত্র দ্বারা দাওয়াত করার প্রচলন শুরু হলো, দেখা গেল সমাজের গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা পত্র প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হতে থাকলো।বদলাতে থাকলো হালখাতার ধরণ।কেননা পত্রের একটি কলামে বাঁকী লেখার জায়গা রয়েছে কাজেই যাদের বাঁকীই নাই তাদের পত্র পাওয়ার কোনো সুযোগ আর রইলো না। হালখাতার মরন ব্যাধিটা যেন এখান থেকেই শুরু হলো, এখান থেকেই শুভ হালখাতার অশুভ লক্ষণ দেখা দিতে থাকে।ধীরে ধীরে হালখাতার সংক্ষিপ্ততা ও সংকীর্ণতা হতে থাকে দোকানির চালাকি আর খরিদ্দারের চাতুরীতে।
যেমন দাওয়াত করা হয়েছে একজনকে, খেতে যাচ্ছে তিন চারজন।কখনও দেখা গেছে বেলা বারোটা বাজার আগে সমস্ত খাবার শেষ।বাঁকীর পরিমান ৫০ হাজার আর আদায় হয়েছে ১০ হাজার।এই অবস্থার স্বরুপ বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞদের মতামতে সিদ্ধান্ত হলো, খাবার টেবিলে যাওয়ার আগেই টোকেন সিস্টেম চালু করা হলো। আগে টাকা দিয়ে টোকেন নিবেন তার পর খেতে পারবেন।
এটা কোন্ ধরনের সম্মান? বা অসম্মানই বা আবার কিসের? কম খরচে টাকা আদায়ের এ ছাড়া আর কী উপায়? এভাবে খরিদ্দারের সম্মান ভাতের থালা থেকে নেমে একপোয়া জিলাপি অথবা তিন পিচ কড়ির (মার্বেল) মাপের রসোগোল্লার সাথে দুটি পাউরুটিতে পরিণত হলো।
তাতেও যখন মহাজনরা বাঁকী আদায়ে ব্যর্থ হতে থাকলো তখন আদায়ের টেবিলে মাস্তান বসিয়ে ভয় দেখিয়ে জামার কলার ধরে কিংবা রাস্তায় সাইকেল আটকিয়ে হালখাতার টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হতে দেখা গেছে।
প্রিয় পাঠক,
এগুলো আসলে কিসের আলামত? গ্রাম বাংলার একজন ছোট ব্যবসায়ীর হালখাতার কার্ড বিতরণের নির্ধারিত তারিখে কোনো গ্রাহক উপস্থিত না হওয়ায় ঐ দোকান মালিক তার মাইক ভাড়াটাও পর্যন্ত দিতে পারেননি এমনও নজির আছে। তাহলে ঐ মাইক সার্ভিস ম্যানকে তার ভাড়ার টাকা আদায়ের জন্য কি হালখাতা করার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে?
পরদিন ঐ দোকানদার হালখাতার প্যাকেট নিয়ে প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্যাকেট দিয়ে বলেছিলেন টাকা না হয় পরেই দিবেন। কিন্তু এগুলো আপনার জন্য জোগাড় করেছিলাম রাখেন। উত্তরে ঐ গ্রাহক গলাটা খাদে নামিয়ে বললেন ঠিক আছে কি আর করা যাবে এনেছেন যখন রেখে যান কয়েক দিনের মধ্যে আপনার পাওনা টাকাটা দিয়ে আসবো। বর্তমানে খুব বিপদে আছি।তাছাড়া হঠাৎ করেই হালখাতার দিন করে ফেলেছেন একটু আগে জানানো উচিৎ ছিল।
প্রিয় পাঠক,
এবার আপনারা বলুন কোনটা উচিৎ আর কোনটা অনুচিৎ? তাই সকল খরিদ্দারের এবং দোকান মালিকদের জানাতে চাই, বাঁকী সওদা বিক্রি করবেন? না হালখাতা করবেন? নগদ বাজার করবেন? না হালখাতার ঘরে ঢোকার আগে জেলখানার কয়েদির মত টোকেন দেখিয়ে খাবারে অংশ গ্রহন করবেন? তাই মৃত্যু পথযাত্রী “শুভ হালখাতাকে” উপযুক্ত সেবা ও উন্নত চিকিৎসা করে আবারো বাচিয়ে তোলার দায়িত্ব আপনার আমার সকলের।
বলছিলাম শুভ হালখাতার মান-সম্মান নিয়ে ব্যবসায়ী আর খরিদ্দারের মধ্যে যে চালাকি চতুরী চলছে এ সব বন্ধ করা হোক। শুভ হালখাতার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক বড় কিছু ত্যাগ করা কিংবা প্রচুর টাকা খরচের প্রয়োজন হবেনা।দরকার শুধু মন মানসিকতার পরিবর্তন।