প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২৩, ২০২৬, ৮:৩০ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ৮, ২০২৫, ৯:৫৩ পি.এম

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগমারা
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মাত্র এক বছর পেরিয়ে সপ্তম শ্রেণীতে উত্তীর্ণের প্রথম সপ্তাহেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল সালেহা বিবিকে। প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও তখন পড়াশোনা ছেড়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল তাঁকে। অপরিপক্ক বয়সেই পাকা গৃহিণীর দায়িত্ব। শুধু কি তাই গৃহস্থালির কাজেও যুক্ত হতে হয়েছিল তাঁকে।
কিন্তু পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সেই মনোকষ্ট তিনি কখনোই ভুলতে পারেননি। প্রতিনিয়তই ইচ্ছে হয়েছে আবারও পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার। কিন্তু নিজের সংসারের অভাব অনটন আর ছেলেদের পড়াশোনা সব মিলিয়ে তা আর হয়ে ওঠেনি। অবশেষে দেরিতে হলেও ধীরে ধীরে তার সেই অদম্য ইচ্ছা পূরণ করছেন সালেহা বিবি।
চলতি বছর ভবানীগঞ্জ কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। ইচ্ছা পোষণ করেছেন আইনজীবী হওয়ারও।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তক্তপাড়া গ্রামের গৃহবধূ সালেহা বিবি (৫৩) তক্তপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহার আলীর স্ত্রী। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী সালেহার জন্ম ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে সে অনুযায়ী বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৫৩ বছর।
গতকাল সোমবার (৭ জুলাই) তক্তপাড়া গ্রামে শাহার–সালেহা দম্পতির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পড়ার টেবিলে বসে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সালেহা বিবি। জানান, আজ তার হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা তাই পড়ার চাপ একটু বেশি।
সালেহা বলেন, লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ থেকেই আবার পড়াশোনা শুরু করেন তিনি।
তাছাড়া পরিবারের লোকজন এবং আত্মীয়-স্বজন সবাই উচ্চশিক্ষিত। তাই স্বামী ও ছেলেদের সহযোগিতায় ২০১৯ সালে উপজেলার শ্রীপুর রামনগর টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের ভোকেশনাল শাখায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন সালেহা। সেখান থেকে ৪.৬০ জিপিএ পেয়ে এসএসসিতে উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর ভর্তি হন ভবানীগঞ্জ কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা কলেজে। চলতি বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে গত ২৬ জুন শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি।
সালেহা বলেন, তাঁর বাবার বাড়ি উপজেলার অর্জুনপাড়া গ্রামে। বাবা আব্দুস সাত্তার ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য। অর্জুন পাড়া গ্রামের নাসের আলী জানান, সালেহা যখন ছোট তখন তার বিয়ে হয়ে যায়। মেয়েটা মেধাবী ছিল, বাল্যকালে বিয়ে না হলে সে হয়তো পড়াশোনা করে অনেক দূর এগিয়ে যেত। স্বামী ও দুই ছেলেকে নিয়ে সালেহার পরিবার। বড় ছেলে শামীম হোসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ছোট ছেলে সাগর হোসেন রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
এই বয়সে আবার লেখাপড়া শুরু করার বিষয়ে সালেহা বলেন, আমরা ছয় ভাইবোনের মধ্যে চারজনই উচ্চ শিক্ষিত। তাঁরা সবাই শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। তাই আমিও পিছিয়ে থাকতে চাই না। ইচ্ছা আছে এলএলবি সম্পন্ন করে আইন পেশায় নিয়োজিত হওয়া।
সালেহার স্বামী তক্তপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহার আলী বলেন, অল্প বয়সে আমার সাথে তার বিয়ে হওয়ায় পড়াশোনার সুযোগ পাইনি সে। এজন্য নিজেকে অপরাধী মনে হয়। তাই তাকে নতুন করে ভর্তি করে দিয়েছিলাম। এখন সে পড়াশোনায় ভালো করছে। তিনি নিজে তাকে পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছে দেন এবং পরীক্ষা শেষে বাড়িতে নিয়ে আসেন বলেও জানান।
সালেহার বড় ছেলে শামীম হোসেন বলেন, আমাদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য মায়ের অবদানই বেশী। এখন নতুন করে সুযোগ হয়েছে তাই আমরা মাকে আবার পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করেছি এবং মা খুব অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এই বয়সে মায়ের লেখাপড়ার ধৈর্য দেখে আমরা অবাক হয়েছি। মায়ের জন্য গর্ব হয়।
আদর্শ টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজের প্রভাষক মাহাবুর রহমান মনি বলেন, সালেহা বিবি নিয়মিত শিক্ষার্থী। তিনি অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে স্বাচ্ছন্দের সাথে পরীক্ষা দিচ্ছেন। এই বয়সেও তাঁর আগ্রহ প্রশংসনীয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম বলেন, এই বয়সে লেখাপড়া সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।সালেহা বিবি অন্যদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।